বাংলাদেশের পর্যটন ও হসপিটালিটি শিল্প: সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত

  • Date : Dec. 18, 2019

"বাংলাদেশের পর্যটন ও হসপিটালিটি শিল্প: সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত"

বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা খুব বেশি দিনের নয়।১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পের আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয়েছে।যেখানে ইংল্যান্ড এ গ্রান্ড ট্যুর শুরু হয়েছিল ১৬৭০ সালে।থমাস কুক ১৮৪১ সালে প্রথম প্যাকেজ ট্যুর আয়োজন করেন লেইচেস্টার থেকে লাভবোরো ট্রেনে করে ৫৭০ জন পর্যটকদের নিয়ে ভ্রমণ করার মাধ্যমে।পর্যটক শব্দটির প্রথম প্রয়োগ হয় ১৭৭২ সালে এবং পর্যটন শব্দের ব্যবহার হয় ১৮১১ সালেসেই তুলনায় বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে নবীন বলা যেতে পারেআমাদের দেশে অনেকেই পর্যটন  বলতে হয়ত বোঝেন হোটেল।নেকে আবার ভাবেন পর্যটন মানে ঘোরাঘুরি করা। হোটেল ও ঘোরাঘুরি ছাড়াও যে আরও কিছু বিষয় পর্যটনের সাথে সম্পর্কিত আছে এটা অনেকে মানতে চান না।

 বিশ্ব পর্যটন সংস্থা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পর্যটকরূপে আখ্যায়িত করতে গিয়ে বলেছে, “যিনি ধারাবাহিকভাবে এক বছরের কম সময়ের কোন স্থানে ভ্রমন অবস্থান পূর্বক স্বাভাবিক পরিবেশের বাইরে দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে অবসর, বিনোদন বা ব্যবসায়িক কর্মকান্ড পরিচালনাসহ অন্যান্য বিষয়াদির সাথে জড়িত, তিনি পর্যটক বলে গণ্য হবেন আর একজন পর্যটককে উপরিউক্ত কর্মকান্ড সম্পাদন করতে যতগুলো কাজের সমন্বয় করতে হয় তা সবই পর্যটনের অন্তভূক্তসহজভাবে বলতে পারি  পর্যটন হচ্ছে ঔ সকল কাজের সমষ্টি যেগুলো  সৃষ্টি  হয় যখন কোনো পর্যটক ভ্রমণ করে অথবা কোনো স্থানে  অবস্থান করে পর্যটনের অন্যতম পাঁচটি স্তম্ভগুলো হল-আকর্ষণ, পরিবহন যোগাযোগ, আবাসন, খাদ্য পানীয়, বিনোদন উপরের এই স্তম্ভগুলো কোন না কোনভাবে ১০৯টি সেক্টরের সাথে যুক্ত এজন্য পর্যটনকে শিল্পের শিল্প বলা হয়

বর্তমানে অনেক দেশের  অর্থনীতি পর্যটন কেন্দ্রীকওয়াল্ড ট্রাভেল এ্যান্ড  ট্যুরিজম কাউন্সিল এর তথ্যানুযায়ী, বর্তমান সময়ে ১০ কোটির মত পর্যটক এক দেশ থেকে অন্য দেশে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।২০২০ সালের মধ্যে এর সংখ্যা ১৬০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। বিপিসির তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প দিন দিন উন্নয়নের পথে এগুচ্ছে।বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা হলে এই শিল্প হবে বাংলাদেশের আর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এবং পর্যটনের মাধ্যমে বদলে যাবে দেশের চিত্রওয়ার্ল্ড ট্রাভেল এ্যান্ড  ট্যুরিজম কাউন্সিলএর তথ্যানুযায়ী,২০১৮ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে ট্রাভেল এ্যান্ড ট্যুরিজম এর অবদান ৪.৪ এবং অর্থনীতিতে ট্রাভেল এ্যান্ড ট্যুরিজম  এর  অবদান ১১.৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার ও এখাতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ২,৪১৪,৪০০ টি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে ২০১৯ সালের মধ্যে এটি ৩,১৫৫,৩০০ এ পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছেপর্যটন এমন এক শিল্প যেখনে সবাই   আর্থিক দিক থেকে সুবিধা পায়।আমেরিকান এক গবেষণা সংস্থার তথ্যানুযায়ী,কোনো দেশে একজন পর্যটক ভ্রমণ করতে গেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩০ জন লোকের কাজের সুযোগ হয়ে থাকেসেসব ক্ষেত্র হচ্ছেঃ পরিবহন,এয়ারপোর্ট এয়ারলাইন্স,কাস্টমার সেবা, ইমিগ্রেশন,ট্যুর অপারেশন,ট্যুর গাইডিং, হোটেল,আবাসন, রেস্টুরেন্ট,ট্যুরিস্ট পুলিশ, পর্যটন সংস্থা ও পর্যটন তথ্য কেন্দ্র ইত্যাদি।

বাংলাদেশে পর্যটন খুবই  সম্ভাবনাময় খাতপর্যটকদের আকর্ষণ করতে যেসব উপাদান প্রয়োজন তার সবই আমাদের দেশে বিদ্যমান,প্রয়োজন শুধু পর্যটকদের কাছে যথাযথভাবে এগুলো  উপস্থাপন করাইউনেস্কো  বাংলাদেশের তিনটি আকর্ষণকে  বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছেন সেগুলো হচ্ছে ; বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড  ম্যানগ্রোভ বন-সুন্দরবন,পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার,ষাট গম্বুজ মসজিদ এছাড়া রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্র সৈকত-কক্সবাজার,বঙ্গোপসাগরের কোলে প্রবাল দ্বীপ-সেন্টমার্টিন দ্বীপ,মহেশখালী দ্বীপ,সোনাদিয়া দ্বীপ,নিঝুম দ্বীপ ও বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ডনৈসর্গিক  প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এর কারণে সিলেটকে আমরা ধরণীর স্বর্গরাজ্য বলতে পারিসিলেটের চা-বাগানগুলোর সৌন্দর্য পর্যটকদের চোখে পড়ার মতবান্দরবানের নীলগিরি,নীলাচল,বগালেক,কেউকারাডং,পাহাড়,জলপ্রপাত,সাঙ্গু নদীর সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়রাঙ্গামাটিসাজেক ভ্যালি এমন একটা জায়গা যেখানে দাড়ালে মনে হবে মেঘের মধ্যে উড়ে বেড়াচ্ছিবাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবেশ ও সহজ-সরল মানুষগুলোর আতিথেয়তা যেকোনো পর্যটকে বারবার গ্রামগুলো ভ্রমণ করতে অনুপ্রাণিত করবেআমাদের দেশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,পালা-পার্বণ যেমন-পহেলা বৈশাখ,পহেলা ফাল্গুন,ঘুড়ি উৎসব,আদিবাসীদের বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠান বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশ নিয়ে আসতে বাধ্য করবে 

পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন প্রসারে বাংলাদেশ সরকার নানামূখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে পর্যটন সংরক্ষণ এলাকা আইন-২০১০ অনুযায়ী,বাংলাদেশের ৩৫ হাজার একর জায়গা পর্যটন সংরক্ষণ এলাকাহিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে  সেন্টমার্টিন দ্বীপ,মহেশখালী দ্বীপ,সোনাদিয়া দ্বীপ,নিঝুম দ্বীপ,সুন্দরবনের কিছু এলাকা  “স্বতন্ত্র পর্যটক অঞ্চলহিসেবে ঘোষণা করা হয়েছেটেকনাফের সাবরাং ১১৬৫ একর জায়গা জুড়ে বিদেশি পর্যটকদের জন্য আধুনিক মানের সকল পর্যটন সেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে  স্বতন্ত্র পর্যটক অঞ্চলেকাজ শুরু হয়েছে নাফ ট্যুরিজম পার্ক ও সোনাদিয়া ট্যুরিজম পার্ক এর কাজ পাইপলাইনে আছে।

সবদিক বিবেচনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশের পর্যটন ও হসপিটালিটি  শিল্পের বর্তমান অবস্থা ভালোর দিকেই যাচ্ছে।পর্যটনের বিকাশের মাধ্যমে পরিবর্তিত হবে অর্থনৈতিক অবস্থা,দেশ ও জাতির উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি পর্যটন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষার মান নিশ্চিতকরনের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পে মানব সম্পদ উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে আসছে।

 

মো:সাইফুল্লার রাব্বী, প্রভাষক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট,ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি          

মোহাম্মাদ বদরুদ্দোজা তালুকদার, সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি